রাজনীতিতে নারীর স্থান: চ্যালেঞ্জ, বাস্তবতা ও ভবিষ্যত


Bangla Prime প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারী ৭, ২০২৬, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ন / ১০০০
রাজনীতিতে নারীর স্থান: চ্যালেঞ্জ, বাস্তবতা ও ভবিষ্যত

সাবিনা নূর: 

১৯৭২ সালে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে। কিন্তু পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই উদ্যোগ নারীদের মূলধারার রাজনীতিতে টেকসই ও শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে নারীদের দলীয় নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল করে রেখেছে, সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

 

সংখ্যা ও পরিসংখ্যান: ৫৩ বছরের চিত্র

১৯৭৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণ আসনে নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ ও নির্বাচিত হওয়ার হার ধারাবাহিকভাবে কম।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী:

  • ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে সাধারণ আসনে কোনো নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হননি।
  • ১৯৮৬ সালে ৫ জন এবং ১৯৮৮ সালে ৪ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত হন (তবে ওই দুই নির্বাচনে মোট নারী প্রার্থীর নির্ভরযোগ্য সংখ্যা পাওয়া যায় না)।
  • ১৯৯১ সালে ৪০ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে ৫ জন নির্বাচিত হন।
  • ১৯৯৬ সালে ৩০ জনের মধ্যে ৮ জন নির্বাচিত হন।
  • ২০০১ সালে ৩৮ জনের মধ্যে ৬ জন নির্বাচিত হন।
  • ২০০৮ সালে ৫৯ জনের মধ্যে ১৯ জন নির্বাচিত হন।
  • ২০১৮ সালে নারী প্রার্থী ছিলেন ৬৯ জন, যা মোট প্রার্থীর প্রায় ৩.৮০ শতাংশ; এ নির্বাচনে সাধারণ আসনে নারী প্রতিনিধিত্ব সর্বোচ্চ ৮ শতাংশে পৌঁছায়।

 

২০১৪ সালের নির্বাচনে ২৯ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে ১৮ জন নির্বাচিত হন এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে ৯৪ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন (প্রায় ৫.১৫ শতাংশ)। তবে ২০১৪ ও ২০২৪ উভয় নির্বাচনই একতরফা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন বলে ব্যাপক সমালোচিত হওয়ায় এসব পরিসংখ্যান প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রতিফলন ঘটায় না।

আসন্ন ২০২৬ সালের নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৫ জন মোট প্রার্থীর প্রায় ৩.৫৩ শতাংশ। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ার বদলে অনেক ক্ষেত্রে স্থবির বা নিম্নমুখী।

 

দলভিত্তিক চিত্র (২০২৬)

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনে যেসব নারী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে বিএনপি থেকে ৯ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে ৩ জন, জাতীয় পার্টি থেকে ৫ জন, গণঅধিকার পরিষদ থেকে ২ জন, গণসংহতি আন্দোলন থেকে ৪ জন, বাসদ থেকে ৩ জন, বাসদ (মার্ক্সবাদী) থেকে ৮ জন, জেএসডি থেকে ৬ জন, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ থেকে ৬ জন এবং গণফোরাম থেকে ২ জন। এই সংখ্যা দেখায় যে বড় দলগুলো এখনো কাঠামোগতভাবে নারীদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি করেনি।

 

সংরক্ষিত নারী আসন: সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা

  1. সংরক্ষিত নারী আসন ব্যবস্থা নারীদের সংসদে সংখ্যাগত উপস্থিতি বাড়ালেও এটি তিনটি মৌলিক সমস্যায় ভোগে।
  2. এসব আসনে নারীরা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নন, ফলে জনগণের প্রতি তাদের জবাবদিহি দুর্বল থাকে।
  3. মনোনয়ন পুরোপুরি দলীয় নেতৃত্বনির্ভর হওয়ায় স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তোলার সুযোগ সীমিত হয়।
  4. সাধারণ আসনে নারীদের প্রার্থী দেওয়ার রাজনৈতিক চাপ কমে যায়। ফলে সংরক্ষিত আসন অনেক সময় ক্ষমতায়নের বদলে প্রতীকী প্রতিনিধিত্বে সীমাবদ্ধ থাকে।

 

আন্তর্জাতিক তুলনা: বাংলাদেশ কোথায়

দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক। নেপালে সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব ৩০ শতাংশের বেশি, পাকিস্তানে তা প্রায় ২০ শতাংশের কাছাকাছি। রুয়ান্ডায় বিশ্বের সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশের বেশি নারী সংসদ সদস্য। এসব দেশে দলীয় কোটা, বাধ্যতামূলক প্রার্থী মনোনয়ন নীতি এবং নির্বাচনী আইনি সংস্কার নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের কাঠামোগত সংস্কার এখনও অনুপস্থিত।

 

মাঠপর্যায়ের বাস্তব বাধা

নারীদের নির্বাচনী রাজনীতিতে আসার পথে কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে:

  • নির্বাচনী ব্যয় ও অর্থনৈতিক অসমতা
  • রাজনৈতিক সহিংসতা, হুমকি ও অনলাইন-অফলাইন চরিত্রহনন
  • সামাজিক ও পারিবারিক চাপ
  • দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এই বাধাগুলো নারী প্রার্থীদের জন্য রাজনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চিত করে তোলে।

 

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও সম্ভাবনা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ কেবল একটি প্রয়োজন নয়; এটি যোগ্যতা, ন্যায্যতা ও সমতার লড়াই। ২০২৬ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়া অনেক নারী প্রার্থী উচ্চশিক্ষিত, পেশাদার ও সামাজিকভাবে সক্রিয় যা সংসদীয় রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করে।

 

করণীয় ও নীতিগত সুপারিশ

নারীদের কার্যকর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে—

  1. রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সাধারণ আসনে ন্যূনতম নারী প্রার্থী মনোনয়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
  2. সংরক্ষিত নারী আসন ব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে সরাসরি নির্বাচনের আওতায় আনতে হবে।
  3. নির্বাচনী ব্যয় সীমা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন ও নারী প্রার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা তহবিল গঠন করতে হবে।
  4. নির্বাচন কমিশনকে দলীয় মনোনয়নে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
  5. রাজনৈতিক সহিংসতা ও অনলাইন হয়রানি রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

সংসদে নারীর উপস্থিতি কেবল সংখ্যার প্রশ্ন নয়; এটি গণতন্ত্রের মান, অন্তর্ভুক্তি ও ন্যায়বিচারের সূচক। ৫৩ বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে প্রতীকী উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। নারীদের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই পারে একটি সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বশীল সংসদ গড়ে তুলতে।

 

লেখা: সাবিনা নূর 

শিক্ষার্থী, সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি

ডিপার্টমেন্ট অফ জার্নালিজম