৭৮ জন নারীর লড়াই, সংখ্যায় অগ্রগতি হলেও সমতায় এখনও পিছিয়ে


Bangla Prime প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারী ৫, ২০২৬, ১১:৫৬ পূর্বাহ্ন / ১০০০
৭৮ জন নারীর লড়াই, সংখ্যায় অগ্রগতি হলেও সমতায় এখনও পিছিয়ে

সুমাইয়া আফরিন সিনহা: 

রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা যায়, রাজনীতিতে অংশ নেওয়া নারী প্রার্থীদের অধিকাংশই উচ্চশিক্ষিত এবং প্রায় ৬৭ শতাংশ বর্তমানে কর্মজীবী। এই পরিবর্তন কেবল সংখ্যাগত নয়, গুণগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষিত ও কর্মজীবী নারীরা রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ায় নেতৃত্বের মান উন্নত হচ্ছে এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বাস্তবধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হচ্ছে। কর্মক্ষেত্র ও সমাজজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকায় তাঁরা জনগণের সমস্যা গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারছেন এবং কার্যকর সমাধানের পথে মতামত দিতে সক্ষম হচ্ছেন।

 

সংখ্যায় অগ্রগতি, প্রতিনিধিত্বে ঘাটতি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্তত ৭৮ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন যা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে এই সংখ্যাই আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় রাজনীতিতে লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করতে আমরা এখনো কতটা পিছিয়ে।

আরও উদ্বেগজনক হলো, এই নারী প্রার্থীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই স্বাধীন রাজনৈতিক পরিচয়ের অধিকারী নন। তাঁদের রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছে মূলত প্রভাবশালী পুরুষ রাজনীতিকের স্ত্রী, কন্যা বা নিকটাত্মীয় হিসেবে। ফলে নারীর অংশগ্রহণ অনেক ক্ষেত্রেই বংশানুক্রমিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে।

এ ছাড়া এই ৭৮ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন মাত্র ৬৭টি সংসদীয় আসনে। অর্থাৎ দেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে সরাসরি নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিত্বের কোনো সুযোগই নেই। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী হলেও, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মোট ১,৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে নারীর অংশ মাত্র ৩.৯৩ শতাংশ যা বাস্তবে অনেকটাই প্রতীকী।

 

যোগ্যতায় নারীরা এগিয়ে, সুযোগে পিছিয়ে

শাসনপ্রক্রিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারবিশেষজ্ঞ মীর নাদিয়া নিভিন মনে করেন, নারী প্রার্থীরা যোগ্যতা ও দক্ষতায় অনেক এগিয়ে থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলো নারীর নেতৃত্ব বিকাশে আন্তরিক নয়। ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী মনোনয়নের শর্তও অনেক দল মানেনি। এবার প্রায় ৩০টি দল কোনো নারী প্রার্থীই দেয়নি, যা নিঃসন্দেহে হতাশাজনক।

তিনি আরও বলেন, সংরক্ষিত আসন নারীর প্রকৃত নেতৃত্ব বিকাশে কার্যকর ভূমিকা রাখছে না। বরং প্রয়োজন রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ও অভিজ্ঞ নারীদের সরাসরি মনোনয়ন দেওয়া। সর্বদলীয় একটি নারী কমিটি গঠন এবং নির্বাচন কমিশনের শক্ত ভূমিকার মাধ্যমে বিষয়টি বাস্তবায়ন করা জরুরি। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দলগুলোর সব কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না হলে সংশ্লিষ্ট দলের নিবন্ধন বাতিল করা উচিত এ দাবিও তিনি জোরালোভাবে তুলে ধরেন।

 

উচ্চশিক্ষিত ও কর্মজীবী নারীর প্রাধান্য

নির্বাচন কমিশনের হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারী প্রার্থীদের বড় অংশই উচ্চশিক্ষিত। স্নাতকোত্তর, স্নাতক, এমফিল ও পেশাগত ডিগ্রিধারী নারীরা রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হচ্ছেন। পেশাগত দিক থেকেও তাঁরা বৈচিত্র্যময় ব্যবসায়ী, আইনজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক, উদ্যোক্তা, উন্নয়নকর্মী, এমনকি শিল্পীও রয়েছেন এই তালিকায়।

এই চিত্র প্রমাণ করে, নারীরা আর কেবল গৃহকেন্দ্রিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নন। তাঁরা সমাজ ও অর্থনীতির মূল স্রোতে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী।

 

সব ক্ষেত্রে নারীর অগ্রাধিকার ও সফলতা

একসময় নারী ছিল অবহেলিত, ঘরের চার দেয়ালে বন্দী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। আজ নারী শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, রাজনীতি, চিকিৎসা, বিজ্ঞান, খেলাধুলা ও সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রেই নিজের যোগ্যতা ও সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে নারীরা এখন অগ্রগামী। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের সাফল্যের হার পুরুষদের চেয়েও বেশি। সরকারের উপবৃত্তি, কোটা ও বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নারীদের এগিয়ে যেতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

কর্মক্ষেত্রেও নারীর পদচারণা দৃঢ়। ব্যাংক, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আইটি খাত, সাংবাদিকতা সব জায়গায় নারীরা দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। অনেক নারী আজ নেতৃত্ব দিচ্ছেন, উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হচ্ছেন এবং অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠছেন।

রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ সমাজে ন্যায্যতা, সহানুভূতি ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় সহায়ক। স্বাস্থ্য, সমাজসেবা, খেলাধুলা ও সংস্কৃতিতেও নারীরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মুখ উজ্জ্বল করছেন।

নারীকে অগ্রাধিকার দেওয়া মানে সমাজের অর্ধেক শক্তিকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো। নারী ও পুরুষ সমান সুযোগ পেলে একটি দেশ আরও দ্রুত ও টেকসই উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে পারে। নারীর সফলতা শুধু নারীর নয় এটি পুরো জাতির সফলতা।